নিজস্ব প্রতিনিধি, অসীম দেবনাথ, কলকাতা:-
শ্রমকোড বাতিলের দাবিতে ফের উত্তাল হল কলকাতা। কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমিক-বিরোধী ও জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে বুধবার শহরের বুকে বিক্ষোভ দেখালেন ব্যাংকের চুক্তিভিত্তিক ও অস্থায়ী কর্মীরা। সংগঠনের ব্যানার হাতে, গলা মিলিয়ে স্লোগান তুলে তাঁরা পৌঁছে যান কলকাতার কেন্দ্রীয় শ্রম দপ্তর—নিজাম প্যালেসে। সেখানেই অনুষ্ঠিত হয় ব্যাংক কন্ট্রাক্টচুয়াল অ্যান্ড কন্ট্রাক্ট ওয়ার্কমেন ইউনিয়ন, পশ্চিমবঙ্গ (বিইএফ অনুমোদিত)–এর ডাকে বৃহত্তর প্রতিবাদ-সমাবেশ।
এই সমাবেশের মূল বক্তব্য—অবিলম্বে শ্রমকোড প্রত্যাহার করতে হবে। নতুন শ্রমকোডকে ‘অমানবিক’, ‘অনৈতিক’ ও ‘শ্রমিকের অধিকারের বিরুদ্ধে ভয়ংকর আঘাত’ বলে দাবি করেন উপস্থিত নেতৃবৃন্দ। প্রতিবাদের চিহ্ন হিসেবে বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্যে শ্রমকোডের প্রতিলিপি পুড়িয়ে প্রতীকী ক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
সমাবেশ পরিচালনা করেন সংগঠনের সভাপতি কমলিকা সেনগুপ্ত। বক্তব্য রাখেন ব্যাংক এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের পক্ষ থেকে সুদীপ্ত সাহা রায়, ব্যাংক কন্ট্রাক্টচুয়াল অ্যান্ড কন্ট্রাক্ট ওয়ার্কমেন ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ ঘোষ, এবং শ্রমিক সংগঠনের সহ: সভাপতি রঞ্জিত দাস অধিকারী।
নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, “২৯টি বিদ্যমান শ্রম আইন বাতিল করে যে চারটি শ্রম কোড চাপিয়ে দিয়েছে কেন্দ্র, তা শ্রমিকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং মালিকপক্ষের স্বার্থরক্ষায় তৈরি।”
তাঁদের দাবি, নতুন শ্রম কোড চালু হলে—
কাজের নিরাপত্তা থাকবে না, কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা থেকে বেড়ে ১২ ঘণ্টা হতে পারে, ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সুরক্ষা দুর্বল হবে, ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, শিল্পক্ষেত্রে নিরাপত্তা—এসব অধিকার আরও খর্ব হবে,
ট্রেড ইউনিয়ন বা সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের অধিকার কার্যত বিপন্ন হয়ে পড়বে।
প্রতিবেদনে জানা যায়, কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম কোড কার্যকর করার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরই শ্রমিক সংগঠনগুলোর অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে। ইতিপূর্বে দেশের প্রায় সব প্রধান ট্রেড ইউনিয়ন একযোগে এই নতুন শ্রম কোডের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল। সারা দেশজুড়ে ডাকা ধর্মঘটেও শামিল হয়েছিল অসংখ্য শ্রমিক সংগঠন। তাঁদের দাবি ছিল—“শ্রম কোড শ্রমিকদের নয়, পুঁজিপতি মালিকদের স্বার্থে তৈরি।”
বুধবারের এই সমাবেশে নেতারা স্মরণ করিয়ে দেন— “শ্রম আইন সরল করার নামে শ্রমিকের বহু বছরের রক্ত-ঘামে অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। মালিকপক্ষের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে শ্রমক্ষেত্রকে দুর্বল করা হচ্ছে।”
নিজাম প্যালেসের সামনে বিক্ষোভ শেষে নেতাদের একটি প্রতিনিধি দল ডেপুটি লেবার কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়। প্রতিনিধি দলে ছিলেন— সুদীপ্ত সাহা রায়, কমলিকা সেনগুপ্ত, বিশ্বজিৎ ঘোষ, কেশব কৃষ্ণ পাত্র, প্রমুখ শ্রমিক নেতা।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়,
“নতুন শ্রম কোডের ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে—এমন দাবি কেন্দ্রীয় সরকার করে থাকলেও বাস্তবে এটি শ্রমিকদের চরম অনিরাপদ অবস্থায় ফেলে দেবে। পুঁজির অত্যাচার বাড়বে, ধর্মঘটের অধিকার খর্ব হবে এবং প্রতিবাদ জানানোকে ফৌজদারি অপরাধে পরিণত করার পথ তৈরি হবে।”
বক্তারা আরও জানান—পুরনো ২৯টি শ্রম আইনে ন্যূনতম মজুরি, কাজের সময়, সামাজিক সুরক্ষা, শিল্প নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক নজরদারি সংক্রান্ত স্পষ্ট নির্দেশ ছিল। যৌথ দরকষাকষির ক্ষমতাও ছিল শ্রমিক সংগঠনগুলোর হাতে। নতুন শ্রম কোডে এ সমস্ত অধিকার প্রায় হারিয়ে যাবে।
বক্তাদের ভাষায়, “এখনই ঐক্য গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতে শ্রমিকদের অস্তিত্বই সঙ্কটে পড়বে। বৃহত্তর সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলনের লড়াই আরও বিস্তৃত করতে হবে আমাদের।”
দিনের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই জানান, ব্যাংকের চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে কাজের স্থায়িত্ব, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে আসছেন। অথচ নতুন শ্রম কোড কার্যকর হলে তাঁদের অবস্থা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এক চুক্তিভিত্তিক কর্মীর কথায়,
“স্থায়ী চাকরির কোনও নিশ্চয়তা নেই। নতুন শ্রম কোড চালু হলে আমাদের উপর মালিকপক্ষের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়বে। চাকরি থাকবে কিনা সেই ভয় প্রতিদিন তাড়া করবে।”
বিক্ষোভকারীদের দাবি—শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা না করেই শ্রম কোড চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ শ্রমিকদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, নতুন কোড চালু হলে দেশব্যাপী বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে।
বিক্ষোভের শেষে সংগঠনের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়— “এই আন্দোলন এখানেই শেষ নয়। শ্রমিক অধিকার বাঁচাতে আরও বৃহত্তর লড়াই তৈরি করা হবে। প্রয়োজনে সারাদেশে আবারও সম্মিলিত আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।”
কলকাতার ব্যস্ত কর্মদিবসের দুপুরে নিজাম প্যালেসের সামনে এই বিক্ষোভ-সমাবেশ স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেল—শ্রম অধিকার খর্বের বিরুদ্ধে শ্রমিক মহল কোনওভাবেই নীরব থাকবে না।
