নিজস্ব প্রতিনিধি,
অভিজিৎ হাজরা, আমতা, হাওড়া :- রায় পরিবারের দুর্গার আরাধনা ও বিসর্জনের সাথেই ত্রয়োদশীর দিন রসপুর মাতৃভান্ডার এর পরিচালনায় শীতলা মাতার আরাধনায় মেতে উঠেছিল রসপুর রায়পাড়াবাসি।গ্ৰামীণ হাওড়া জেলার আমতা ১ নং ব্লকের রসপুর গ্ৰামের রায়পাড়া বিখ্যাত দুর্গাপূজার জন্য। রসপুর রায় পরিবারের দুর্গা প্রতিমার আরাধনা ও বিসর্জনের পর ত্রয়োদশীর দিন শীতলামাতা পুজায় রসপুর রায়পাড়াবাসি মেতে উঠেছিল। ত্রয়োদশীর দিন শীতলামাতা পুজা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে রায় পরিবারের সদস্য তথা মাতৃ ভান্ডারের সম্পাদক পিনাকী ( কৌশিক) রায় বলেন,” এই শীতলামাতা পুজা সম্পর্কে জানতে গেলে আগে জানতে হবে,রায় পরিবারের উৎপত্তি ও দুর্গা পূজা,মাতৃ ভান্ডারের প্রতিষ্ঠা ও তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য,মাতৃ ভান্ডারের কাজ সম্পর্কে। রায় বংশের উৎপত্তি ও দুর্গা পূজা প্রসঙ্গে অসীম মিত্র বলেন, ” প্রাচীন কালে বঙ্গদেশে যুদ্ধপ্রিয় (কায়স্থ) দেব বংশ বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিল। রসপুরের রায় বংশ এই দেব বংশের কাশ্যপ গোত্রীয় এক শাখা হইতে উদ্ভুত। বর্তমানে এই দেব বংশের লোকেরা ‘ রায় ‘ পদবী ব্যবহার করছেন বটে , কিন্তু পূর্বে তারা তাদের নামের শেষে ‘ দেব ‘ পদবী ব্যবহার করতেন।’ রায় ‘ বংশের আদি পুরুষ ছিলেন যশশ্চন্দ্র রায়।যশশ্চন্দ্রের আদি নিবাস বা পূর্ব পুরুষেরা কোথা থেকে এসে রসপুরে বসতি স্থাপন করেন তার কোন সঠিক বিবরণ পাওয়া যায় নি।তা সত্ত্বেও প্রামাণিক পুস্তক, দলিল পত্র এবং কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, যশশ্চন্দ্র বর্ধমান জেলা থেকে এসে রসপুরে বসতি স্থাপন করেন। সম্রাট শেরশাহের আমলে কয়েকজন পাঠান কর্মচারীর সঙ্গে যশশ্চন্দ্র রসপুরে আসেন এবং শেরশাহের আমলেই তিনি রাজকীয় মর্যাদা ও প্রতিপত্তি লাভ করে সম্ভ্রমসূচক ‘ রায় ‘ উপাধি প্রাপ্ত হন।১৫৪০ থেকে ১৫৪৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে শেরশাহের আমলেই মহামতি যশশ্চন্দ্রের অভ্যুদয় হয়। রসপুরে বসবাসের সঙ্গে তিনি নিজ বাড়িতে দুর্গাপূজার প্রবর্তন করেন ১৫৪৫ খ্রীষ্টাব্দে ” । মাতৃ ভান্ডার প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে রায় পরিবারের সদস্য তথা মাতৃ ভান্ডারের সম্পাদক পিনাকী (কৌশিক) রায় বলেন, ” যশশ্চন্দ্র রায় দুর্গাপূজা প্রবর্তন করেছিলেন এবং অত্যন্ত জাঁকজমক সহকারে পূজা করতেন। তৎকালীন সময়ে তিনি গরীব – দুঃখীদের বস্ত্র উপহার দিতেন। পূজার কয়েকটি দিন খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতেন। তৎকালীন সময়ে গ্ৰামবাসীদের জীবন যাপন স্বচ্ছল ছিল না।১২৯৪ বঙ্গাব্দে রায় বংশের পুলিনচন্দ্র রায় এলাকার উন্নয়ন, মানুষদের আর্থিক উন্নয়ন, এলাকার ছেলে – মেয়েদের শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসার জন্য সাহায্য – সহযোগিতা,কন্যা দায়গ্ৰস্ত পরিবারের পিতা – মাতাদের কন্যার বিবাহে সাহায্য সহযোগিতা ও পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বিবাহ কার্য্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা, মানুষদের সুখে – দুঃখে পাশে থেকে নানান সাহায্য করার জন্য চিন্তা – ভাবনা করে ১২৯৫ (১৮৮৮ সালে) বঙ্গাব্দে রায় পরিবারের সদস্যদের ও গ্ৰামবাসীদের নিয়ে গঠন করেন একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের নাম করণ করেন ’ মাতৃ ভান্ডার ‘ । তৎকালীন সময়ে গ্ৰামবাসীদের বিনোদনের সেমত সুযোগ ছিল না। এলাকার মানুষদের বিনোদনের ও ব্যবস্থা করে মাতৃ ভান্ডার। দুর্গা মাতার সঙ্গে এই স্থানে শিতলা মাতা থাকার কারণে দুর্গা পূজার পর ত্রয়োদশীর দিন শীতলামাতা পুজা উপলক্ষে যাত্রা,নাটক, হরিনাম সংকীর্তন,শীতলা মাতার গান,রাম যাত্রা,কেষ্ট যাত্রা সহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর ব্যবস্থা থাকতো।দুঃস্থ মানুষদের সাহায্য করা হতো। যুগের পরিবর্তন,সময়ে তালে তালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছোট করতে হচ্ছে।তার কারণ বর্তমানে বিনোদন এর সুযোগ ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। মোবাইল এর দাপটে মানুষ আর গ্ৰামের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এ অংশগ্ৰহণ,দেখতে আসতে চাইছে না। অনুষ্ঠানে দর্শক হচ্ছে না।যে কারণে বর্তমানে ওই সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয় না।তবে গ্ৰামীণ ছেলে – মেয়েদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছোট করে করা হয়।এর পাশাপাশি চিরাচরিত ভাবে গ্ৰামীণ ছেলে – মেয়েদের শিক্ষার উৎসাহ প্রদান করা হয়। স্থানীয় রসপুর বালিকা বিদ্যালয় ও রসপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এর মাধ্যমিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত ছাত্র -ছাত্রীদের ” আরতী রায় স্মৃতি মেধা ” পুরষ্কার প্রদান করা হয়।
