
নিজস্ব প্রতিনিধি, রোকনুজ্জামান,বাংলাদেশ:
শীত যতই বাড়ছে,ততই বেড়ে চলেছে খেজুরের রসের কদর।গ্রামীণ জনপদে শীতকাল মানেই খেজুরের রস,পিঠা,পায়েস আর গুড়ের মৌসুম। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার তিখুর গ্রামের গাছি ফারুক হোসেন খেজুরের রস সংগ্রহ ও বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। প্রতিদিন তার কাছে রস খেতে ও কিনতে ভিড় করছেন প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ জন ক্রেতা।
হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খেজুর গাছে উঠে রস সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। প্রতিদিন বিকেলে খেজুর গাছের উপরিভাগে বাটাল ও ধারালো ছেনতা দিয়ে চাঁচ কেটে সেখানে মাটির কলসি কিংবা প্লাস্টিকের বোতল বেঁধে দেওয়া হয়। নলের মাধ্যমে ফোঁটা ফোঁটা করে সারা রাত ধরে রস জমা হয়। পরদিন ভোরে সেই রস সংগ্রহ করা হয়। কেউ তাৎক্ষণিকভাবে কাঁচা রস বিক্রি করেন, আবার কেউ সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করেন পাটালি ও লালি গুড়।
গাছিরা জানান, শীত মৌসুমের শুরুতেই খেজুরের রস সংগ্রহ শুরু হয়। বর্তমানে কাঁচা খেজুরের রস প্রতি লিটার ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ রস দিয়ে তৈরি লালি ও গুড় প্রতি কেজি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়। চাহিদা বেশি থাকায় অনেক সময় কাজের চাপে বিশ্রামের সুযোগও পান না তারা।
গাছি ফারুক হোসেন বলেন, “চলতি মৌসুমে আমি ৪০টি খেজুর গাছ রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করেছি। শীত শুরুর আগেই গ্রামের বিভিন্ন পরিবারের কাছ থেকে গাছগুলো লিজ নিয়ে থাকি। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৯০ থেকে ১০০ লিটার খেজুরের রস সংগ্রহ হয়। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ জন মানুষ রস খেতে আসেন। কেউ সরাসরি রস পান করেন, আবার কেউ পরিবারের জন্য বোতলে করে নিয়ে যান। প্রতি লিটার ৫০ টাকা দরে বিক্রি করে প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করছি। পুরো শীত মৌসুমে এই আয় ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
রস কিনতে আসা জাহিদ হাসান, জামান ও যুবায়েরসহ একাধিক ক্রেতা জানান, খেজুরের কাঁচা রস যেমন সুস্বাদু, তেমনি এ রস দিয়ে তৈরি লালি ও গুড় আরও বেশি স্বাদযুক্ত। শীতের পিঠা তৈরিতে খেজুরের গুড়ের কোনো বিকল্প নেই। বাজারে গুড় পাওয়া গেলেও গাছির কাছ থেকে সংগ্রহ করা টাটকা রস দিয়ে নিজ হাতে গুড় বানানোর স্বাদ আলাদা হওয়ায় তারা সরাসরি গাছির কাছ থেকেই রস কিনছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম ইলিয়াস বলেন,খেজুরের রস আমাদের ঐতিহ্যবাহী ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি খাদ্য। রস সংগ্রহের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। গাছি ও ভোক্তাদের সচেতন থাকতে হবে যেন রস ঢেকে রাখা হয় এবং স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়। এভাবে রস ও গুড় উৎপাদন বাড়লে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
খেজুরের রস ও গুড়ের এমন জমজমাট বাজারে যেমন স্বাদ ও ঐতিহ্য টিকে আছে, তেমনি গাছি ফারুকের মতো অনেকেই এই পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছেন।
