নিজস্ব প্রতিনিধি, অসীম দেবনাথ,সমকাল সংবাদ
,বারাসাত:- ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে কেন্দ্রীয় সরকার যখন একাধিক সরকারি ব্যাংককে সংযুক্ত (মার্জ) করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সরকারি অর্থনীতির পুনর্গঠন ও দক্ষতা বৃদ্ধির যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ই সারা দেশ জুড়ে হাজার হাজার ঠিকা শ্রমিক— যাদের কেউ সরাসরি, কেউ বা এজেন্সির মাধ্যমে কাজ করছিলেন— কাজ হারান। ব্যাংকের শাখা ও কার্যালয় সংখ্যা কমে যাওয়ায় বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন। রবিবার বারাসাত জেলা পরিষদ হলে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠানে ব্যাংক কর্মী সম্মেলিত হন।
ওখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মার্জ কে ধিক্কার জানিয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন। এবার আবারও সেই আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার নতুন করে বাকি সরকারি ব্যাংকগুলিকেও মার্জ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। অর্থাৎ, ছোট ব্যাংকগুলোকে আরও বড় ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করে দেওয়া হবে। ফলে প্রশাসনিক খরচ কমবে, তবে বিপাকে পড়বেন নিচুতলার কর্মীরা— বিশেষ করে ঠিকা শ্রমিকরা।
সূত্রের খবর, ব্যাংকগুলির মধ্যে প্রশাসনিক কাঠামো একীভূত হলে বহু শাখা বন্ধ বা একত্রিত হতে পারে। এতে সরাসরি প্রভাব পড়বে দপ্তর পরিচারক, নিরাপত্তারক্ষী, কেরানি, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, পরিষেবা কর্মী ও অন্যান্য আউটসোর্সড স্টাফদের ওপর। এই কর্মীরা সাধারণত স্থায়ী নন, ফলে মার্জারের পর তাদের চাকরি রক্ষা করার কোনও গ্যারান্টি থাকে না।
কমরেড দেবাশীষ বসু চৌধুরী জানান, “২০১৯ সালে মার্জারের সময় আমাদের রাজ্যে প্রায় ৪০০–র বেশি ঠিকা কর্মী কাজ হারিয়েছিলেন। এবার যদি আরও বড় পরিসরে মার্জার হয়, তাহলে সেই সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যাবে।”
ইতিমধ্যেই কর্মী সংগঠনগুলো সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। অল ইন্ডিয়া ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন (AIBEA) এবং ব্যাংক এমপ্লয়িজ ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (BEFI) যৌথভাবে দাবি জানিয়েছে, মার্জারের নামে শ্রমিক ছাঁটাই মেনে নেওয়া যাবে না। তাঁরা বলছেন, “যে ব্যাংকগুলোতে এখনও বহু গ্রামীণ শাখা চলছে, সেখানে ঠিকা শ্রমিকরাই পরিষেবা টিকিয়ে রাখছেন। মার্জারের ফলে এই পরিষেবাগুলো বন্ধ হলে দেশের সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।”
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক মার্জার একদিকে সরকারের রাজস্ব সাশ্রয় করলেও, অন্যদিকে বেকারত্বের হার বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকায় ব্যাংকের পরিষেবা যদি সীমিত হয়ে যায়, তবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে বাধা আসবে।
এদিকে, বেকার ঠিকা শ্রমিকদের জীবনে নতুন করে অনিশ্চয়তার ছায়া নেমেছে। দীর্ঘদিন ধরে যারা ব্যাংকের প্রশাসনিক বা টেকনিক্যাল কাজে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ এখন ঝুলে আছে সিদ্ধান্তের দড়িতে।
এক প্রাক্তন ঠিকা কর্মীর কথায়, “আমরা ব্যাংকের পরিবারেরই অংশ ছিলাম, অথচ এখন আমাদের নামই নেই তালিকায়। নতুন মার্জারের খবর শুনে ফের ভয় পাচ্ছি, আরও কতজন এবার রাস্তায় নামবেন।”
ব্যাংক মার্জারের অর্থনৈতিক যুক্তি থাকলেও মানবিক দিকটা যেন বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। সরকারের উদ্দেশে শ্রমিক সংগঠনগুলির প্রশ্ন — “অর্থনীতির সংস্কার যদি মানুষের জীবন ধ্বংসের কারণ হয়, তবে তা কতটা উন্নয়ন?”
